অসার চেতনা

- Bristy La wayfarer 



পোশাক আসলে কাউকেই কিছু বানায় না। না বিজ্ঞানী, না পণ্য। পোশাক হচ্ছে আপনার বাহ্যিকতার প্রদর্শন। কিছুটা মননশীলতাও বোঝা যায় তাতে। এতে এটাও বোঝা যায় যে আপনি জীবন চলার ক্ষেত্রে আসলে কোন বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। আপনি যদি আপাদমস্তক ঢেকে চলেন, তখন আপনার শরীর নিয়ে আপনার রক্ষণশীল মনোভাবের একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কেউ যদি সালওয়ার কামিজ, শাড়ি, জিন্স-টিশার্ট কিংবা শর্টস পরে, তাতে এতোটুকু বোঝা যায় যে শরীরের রক্ষণশীলতা নিয়ে তাদের খুব চিন্তা নেই। অবশ্যই তাতে কে কিভাবে বাহ্যিকভাবে নিজেকে ভালোবাসে এটা যার যার ব্যাক্তিত্বের উপর নির্ভর করে।

এখন আমরা স্কুল কলেজ, অফিস-আদালতের জন্য একটা নির্দিষ্ট ড্রেস কোড মেইনটেইন করি কারণ সেখানে সবাই এক, ভিন্নতা দূরীকরণ করা হয়। কিংবা কোনো একটা অকেশন অনুযায়ী আমরা কাপড় চোপড় পরি। কিন্তু সাধারণ দিনগুলোতে, বাইরে বের হতে হলেও কি নির্দিষ্ট ড্রেস কোড মেইনটেইন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? আপনি বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছেন কিংবা কোথাও বসে গল্প করছেন, বাজারে যাচ্ছেন কিংবা কোথাও ভ্রমণে যাচ্ছেন, তার জন্যে কি আপনাকে একটা নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করতে হবে?


এরপর আসে সংস্কৃতির কথা। সংস্কৃতি ম্যাথমেটিকসের কোনো কন্সট্যান্ট ভ্যালু নয়, এটি আলোর বেগ নয় যে অপরিবর্তশীল রয়ে যাবে, যার কোনো নির্দিষ্টতা থাকতে হবে। সংস্কৃতি কোনো ঐশ্বরিক বাণীও নয়। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ স্থান, কাল, পরিবেশভেদে বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, এসব ই বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের কথা ধরেন, তাদের ভৌগোলিক পরিবেশ, এবং সেই পরিবেশে গড়ে ওঠা মানুষদের চিন্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। আমরা জাতিগত ভাবে সংকর জাতি। আমাদের আদিবাসীদের পোশাক কেমন হয়, তা আমরা জানি। কিন্তু শুরু থেকেই কি আমরা আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করে এসেছিলাম? আমাদের পোশাক তো ছোট স্কার্ট কিংবা বোরকা আলখাল্লা কোনোটাই নয়, তাহলে সংস্কৃতি আমরা কতটা রক্ষা করে চলছি? এখন কেউ যদি মধ্য প্রাচ্যের সংস্কৃতি গ্রহন করে নিজের দেশীয় সংস্কৃতিকেই অপসংস্কৃতি ডাকা শুরু করে তাহলে এখানে সংস্কৃতির সম্মান কতটা রক্ষা হলো? একই কথা পশ্চিমা সংস্কৃতি যারা ধারণ করে তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।  সহজ কথা হচ্ছে আমি যেকোনো একটা সংস্কৃতি ধারণ করে কি করে অন্য একটা সংস্কৃতির উপর আঙুল তুলতে পারি? যা স্থান, কাল, পরিবেশ ভেদে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করে নেওয়া, তা মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন পরিবর্ধন করতেই পারে। এবং প্রত্যেকে তার কম্ফোর্ট অনুযায়ী সেটা করবে যা একদম স্বাভাবিক। এবং এভাবেই সংস্কৃতি সামনে আগায়, অবক্ষয় হয়না।


এরপর আপনি যেকোনো একটা পোশাক পরেন কেনো এবং কি বুঝে পরেন? নিশ্চয়ই নিজের ভালো লাগার উপর নির্ভর করে এবং নিজে যেটা পরে ভালো অনুভব করেন তাই পরেন। আপনার শরীরে আপনি কোনটা পরে আরাম অনুভব করেন তা অন্য কেউ তো অবশ্যই বলে দিতে পারবেনা, কিংবা অন্য কারো মস্তিষ্ক আপনাকে কেন্দ্র করে কি চিন্তা করছে তার উপরও নির্ভর করেনা। তা কে সালওয়ার কামিজ পরলো আর কে বোরকা পরলো তাতে কি আসে যায়? কারো যদি কাউকে নিয়ে নেতিবাচক কিছু ভাববার থাকে কিংবা সেক্সুয়াল এরাউজাল নিয়ে যদি কেউ কারো উপর দৃষ্টিপাত করে সে অবশ্যই পোশাক দিয়ে তা কোনোভাবেই করেনা, এই সাধারণ সেন্সটুকু আমাদের সবার মাঝে আছে, এটা নিয়ে বিস্তারিত বলার কিছু নেই। মনে করুন কোনো বোরকা পরোয়া মেয়ে তার প্রেমিকের সাথে বেড়াতে গিয়েছে, তখন সেই বোরকা দেখে কি সেই প্রেমিকের কি প্রেম বাদ দিয়ে ভাতৃত্ব জেগে উঠবে বা তার প্রেম জাগরণে কি সেই বোরকা বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে?  হয় কখনো এমনটা? অবশ্যই না। আমরা আসলে পোশাক নয়, ভেতরের মানুষটাকে খুঁজি, তা মনের জন্য হোক কিংবা শরীরের জন্য হোক। পোশাক কখনো কিছুর মাত্রা নির্ধারণ করেনা। যেহেতু করছেনা সেহেতু কে কাকে দেখে হঠাৎ সিডিউস হলো এবং কারা আসলে রাস্তাঘাটে বের হয় সেক্সুয়াল এরাউজাল নিয়ে যে যাকে তাকে দেখলেই তারা আসলে নিজেদের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে, এবং এটা কতটা স্বাভাবিক নাকি তারা কোনোভাবে অসুস্থ সেটা অবশ্যই ব্যাক্তি পর্যায়ে পড়ে। তাই এই দায়ভারটা যার এধরণের সমস্যা হচ্ছে তাকেই নিতে হবে। আমি আপনি কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো কিছু দিয়েই কোনো কিছু করতে পারবোনা। 

এধরণের মনোভাব আমার তো রাস্তায় বের হলে হয়না। কাউকে দেখলে কি করে কেউ সিডিউস হতে পারে? আমি কি সেই ব্যাক্তিটিকে জানি? তার সাথে আমার সেই সম্পর্কটা রয়েছে যে আমি তার দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকাবো!  যদি না হয়, আর তবুও যদি আপনারা সিডিউস হোন তাহলে আপনারা কি সকল নারীদের প্রতিই অতি প্রেমময় বা সিডাকশনের দৃষ্টি নিয়ে তাকান?  আপনাদের দৃষ্টিতে সকল নারী সমান?  মা,বোন, বন্ধু, প্রেমিকা, স্ত্রী কিংবা অপরিচিত, এদের কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননা আপনারা?

আর যদি মনে হয় আপনারা আসলে কোনো কিছুর মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছেন না, সবই একরকম লাগে তাহলে বুঝতেই পারছেন আপনারা চরমভাবে মানসিক রোগে ভুগছেন। সেক্ষেত্রে আপনাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলতে পারি আপনারা অতি দ্রুততার সঙ্গে চিকিৎসকের দারস্থ হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনাদের নিজেদের সমস্যার কারণে আপনার ঘরেও কিন্তু নারীরা সুরক্ষিত নয়।

কেউ বলছে সম্মতি ছাড়া সিডিউস করা মানসিক ধর্ষন।

তাহলে কারো সম্মতি ছাড়া তার দিকে যৌনতার দৃষ্টি নিয়ে তাকানো কি মানসিক ধর্ষন নয়? 

আচ্ছা পাবলিক নুইসেন্স কাকে বলে? আপনি পাবলিকলি এমন একটা অপরাধ করা যা সেখানে উপস্থিত সকলের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হয়েছে। 

পোশাকের সাথে পাবলিক নুইসেন্সের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

আপনি ধুমপান করছেন, যা অন্যকে বিব্রত করতে পারে তা পাবলিক নুইসেন্স। রাস্তাঘাটে যেখানে খুশি সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করছেন, থুথু ফেলছেন, ময়লা আবর্জনা ফেলছেন তা পাবলিক নুইসেন্স। কারো সাথে পথে ঘাটে বসে মারামারি করছেন তা পাবলিক নুইসেন্স। হঠাৎ করেই জোরে জোরে মাইক বাজাচ্ছেন তাও পাবলিক নুইসেন্স। কারো দিকে কুদৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন, সেটাও কিন্তু পাবলিক নুইসেন্স। কিন্তু যারা পোশাক নিয়ে কথা বলছেন তারা কিন্তু আসল পাবলিক নুইসেন্স নিয়ে একদমই বিব্রত নন। দেখুন গিয়ে রাস্তায় বাদাম খেতে খেতে খোসা ফেলতে ফেলতে যাচ্ছে, একবারো বিন্দুপরিমাণ ও অপরাধ বোধ কি তখন তাদের মনে কাজ করে?

যারা আসলেই যা ক্ষতি করছে সেসব নিয়ে না ভেবে, যার আসলে কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই সেসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে বেড়ান তাদের কথা আসলে পুরো একটা জাতির জন্য কতটা গ্রহনযোগ্য বলে আপনাদের মনে হয়?


কেউ বলছেন একজনের পোশাকের জন্য আরেকজন নির্যাতিত হচ্ছেন! 

না আসলেই একটু ভেবে দেখুন তো আপনারা এই কথাটা বলার আগে কি একবারো একটুর জন্যও ভেবে দেখেছেন আপনারা কত বড় ক্রাইমকে সাপোর্ট করছেন? ভেবে দেখেছেন? এক কথায় আপনারা অপরাধী এবং অপরাধকে যেনো ছাই দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছেন। এবং এতে করে হবে কি জানেন?  কাল আপনার সঙ্গে যখন কেউ দূর্ব্যবহার করবে কিংবা এমন কিছু করবে যা অন্যায়, তাও আপনার এই কথার মাধ্যমেই জাস্টিফিকেশান পেয়ে যাবে। কোনো দোষ ছাড়াও আপনারা নির্যাতন মেনে নিতে বাধ্য হবেন।

সময় এখনো আছে, ভাবুন। ভাবা প্র্যাকটিস করুন।

আসলে যেসব নারীরা এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছেন, তাদের প্রতি আমার মায়া হয়। তারা তাদের দ্বারা সৃষ্ট অন্ধকার ভবিষ্যৎটাকে দেখতে পাচ্ছে না। শরীরের সাথে সাথে তাদের চোখ, চিন্তা সবকিছুর ওপর কয়েক ধাপের পরদ জন্মে গিয়েছে। আর এমন একটা সমাজ, পরিবেশে তারা অবস্থান করছে যে তাদের এই ভয়াবহতার উপলব্ধি তাদের মধ্যে নেই। এবং হবে সেই আশাও করা যাচ্ছে না।


আর পরিশেষে আবার বলবো, পোশাক আপনাকে কিছুই বানায় না। আপনাকে আপনি করে গড়ে তোলে আপনার বুদ্ধিমত্তা। আর বুদ্ধিমত্তা কোনো মাপজোখের কাপড় দিয়ে ঢাকা যায়না। সেখানে সংস্কৃতির মান রক্ষাও চলেনা। যে যাই পরুন না কেনো, যদি বুদ্ধিমত্তাকে কাপড় দিয়ে ঢাকতে যান তাহলে নিজেই নিজেকে কালের গহীনে হারিয়ে ফেলবেন, ফিরে পাবেন না। শরীরকে যেভাবেই রাখেন না কেনো, বুদ্ধিটাকে উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করবেন।

ধন্যবাদ।